"অপেক্ষার শহরে রূপকথা"

 


মিমকে প্রথমবার দেখে আলিফের মোটেই পছন্দ হয়নি। মিম তেমন একটা রূপবতী নয়, অতি সাধারণ এক মেয়ে। তবে আড্ডার একপর্যায়ে মিমের চোখের দিকে তাকাতেই আলিফের বুকটা কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠল। মেয়েটার চোখে কেমন এক অলৌকিক ছলছলে মায়া! যেন কাউকে হন্যে হয়ে খুঁজছে সে, গভীর কোনো শূন্যতা বয়ে বেড়াচ্ছে। আলিফের মনে কৌতূহল জাগলেও সে প্রথমটায় তেমন পাত্তা দিল না।আড্ডা শেষে সবাই যখন নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার তোড়জোড় করছে, ঠিক তখনই মিমের মুখের কয়েকটা কথা শুনে আলিফ থমকে গেল।


 এতটা সততা, এতটা স্বচ্ছতা আর নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো নিঃসংকোচ সত্য প্রকাশ আজ পর্যন্ত সে কারও মুখে শোনেনি! মুহূর্তের মধ্যে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মাতাল হাওয়া আলিফের হৃদয়কে ধুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেল। আড্ডার শেষে মিম যখন অটোতে গিয়ে উঠল, আলিফের মনে হলো মিমকে বিদায় দেওয়া মানে যেন তার জন্য এক আজীবন কারাদণ্ড! মিমের অটোটা চোখের আড়ালে মিলিয়ে যাওয়ার পরও আলিফ স্তব্ধ হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বারবার বেজে উঠছে, বাসায় ফেরার তাগিদ দিচ্ছে। কিন্তু আলিফের কানে তখন মিমের সেই সরল কথাগুলোর গুঞ্জন ছাড়া আর কিছুই পৌঁছাচ্ছে না।

 চারপাশের ব্যস্ত শহরের হর্নের শব্দ, রিকশার বেল, কিংবা অটোচালকের হাঁকডাক। সব যেন এক অচিন নীরবতায় হারিয়ে গেছে।কিছুক্ষণ পর হুশ ফিরলে নিজেকে সামলে নিয়ে আলিফ বাসায় ফিরল। শিক্ষককে পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শেষ করে যখন সে নিজের ঘরে ঢুকাল, তখন ঘরের আলোটা ধিমে করে দিয়ে একা একা ভাবতে বসল। মিম দেখতে কেমন ছিল? মনের ক্যানভাসে ছবিটা মোটেও স্পষ্ট নয়, বড্ড অস্পষ্ট। মিমকে আবার দেখতেই হবে! কিন্তু কীভাবে? তার উদগ্রীব মন চটজলদি বাহানা খুঁজতে শুরু করল। শেষমেশ এক মোঘলাই বাহানা বানিয়ে ফোন দিলাম ‘হালকাট জাওয়ানি’ খ্যাত বন্ধু মালিহাকে। মালিহার সামান্য সন্দেহ হলেও, আলিফের রসাল বাহানার তোড়ে সেই সন্দেহ বাষ্প হয়ে উবে গেল। এভাবে মিমের সাথে বারবার দেখা করার জন্য আলিফের নিত্যনতুন বাহানা খোঁজা শুরু হলো। যে বাহানাগুলো শুধুই অদ্ভুত ছিল না, ছিল বেশ শিশুতোষও। সময় নদীর মতো বয়ে চলে, দিন গড়ায়। সময়ের সাথে সাথে দুজনের সম্পর্কের গভীরতাও বাড়তে থাকে। 

এখন আর অহেতুক কথার প্রয়োজন হয় না, শুধু নিস্তব্ধতা দেখেই একজন অন্যজনের মনের আলো-ছায়া টের পেয়ে যায়। মিম আর আলিফের এই স্বর্গীয় বন্ধুত্বের বয়স দেখতে দেখতে প্রায় চার মাস ছুঁয়ে গেল। সামনে ঈদ। আলিফের মনে হলো, এবার মিমকে বিশেষ কিছু উপহার দেওয়া চাই। কিন্তু কী দেওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আলিফের রাতের ঘুম হারাম হওয়ার উপক্রম! মিমকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন বিকেলে সে একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল। স্বপ্নে দেখল। মিম আভিজাত্যের এক নীল শাড়ি পরে হেঁটে যাচ্ছে। স্বপ্নেই অনুভূতির টানে হাত বাড়িয়ে মিমকে ছুঁতে গিয়ে আলিফ খাট থেকে সটান নিচে থপাস করে পড়ে গেলো! মাথা ডলতে ডলতে আম্মুর বকুনি শুনল, "তুই কি এখন দিনদুপুরে বাস্তবে আর রাতে স্বপ্নে একই ভূত দেখা শুরু করলি নাকি রে?"আলিফের লাজুক মুচকি হাসি দেখে মায়ের আর বুঝতে বাকি রইল না। ছেলে অনুভূতির এক গভীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে!শাড়ি কিনতে যাওয়ার দিন হঠাৎ মুখভার করে বৃষ্টি নামল। ভিজে একাকার হয়ে আলিফ যখন জলিল টাওয়ারের নিচে পৌঁছাল, 

তখন ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মিমকে একদম অন্যরকম লাগল। বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে আলিফ হা করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। 

মিমের মিষ্টি মুখটা যেন কোনো অদৃশ্য আলোয় জ্বলজ্বল করছে! হাওয়া এসে তার চুলগুলোকে ধীরে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর তার ব্যাকগ্রাউন্ডে অঝোর ধারায় ঝরছে বৃষ্টি। মাঝে মাঝে মেঘের বিজলি চমকালে মিমের অবয়বে যেন এক রূপকথার ছোঁয়া লেগে যায়। সে এক অভূতপূর্ব, অপার্থিব দৃশ্য!

 সারাটা জীবন স্মৃতির মণিকোঠায় যত্ন করে রেখে দেওয়ার মতো এক মায়াবী মুহূর্ত।কিন্তু শাড়ির দোকানে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। কোনো শাড়িই আলিফের পছন্দ হয় না! সবই যেন নিছক রঙহীন কাপড়ের টুকরো। 

মিমের স্নিগ্ধতার সামনে যেন পৃথিবীর সব রঙই ফ্যাকাশে আর অর্থহীন। সকাল থেকে শহরের এ-দোকান সে-দোকান ঘুরেও মনের মতো কিছুই মিলছে না। মিলবেই বা কীভাবে? মিম তো সাধারণ কেউ নয়, মিম যে অনন্যা! আর তার জন্য চাই এক অনন্য রাজকীয় রূপকথা।


সারাদিন ধরে মিমের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে কাটার পর, একদম বেলাশেষে একটা শাড়ি মন ছুঁয়ে গেল। শাড়িটা মিমের গায়ে হালকা করে স্পর্শ করাতেই মনে হলো, শাড়িটাই যেন মিমকে আপন করে নিতে পেরে ধন্য হলো! এতদিনে আলিফের মনে হলো, মিমকে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যের চেয়েও সুন্দর লাগছে। যার কোনো ব্যাখ্যা কোনো ডিকশনারিতে নেই। যদি বলতেই হয়, তবে সে কোনো পরী নয়, রূপকথার পরী রাজ্যের অধেশ্বরী এক রানী!...

তবে, মিম আর আলিফের সেই মিষ্টি গল্পটা শেষ হয়ে গেছে আজ বহু বছর আগে।


স্মৃতির পাতাগুলো এখন বড় বিষাদময়। আর সেই মিমের স্মৃতিতেই বুকচাপা হাহাকার বয়ে নিয়ে, আলিফকে আজ চিরতরে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে তার প্রাণপ্রিয় খুলনা শহরটা। 

রেখে যেতে হচ্ছে স্মৃতির ধুলোমাখা পথ, 

জলিল টাওয়ারের সেই বৃষ্টি আর অধরা থেকে যাওয়া এক অনন্য পরীকে!

Comments

Popular posts from this blog

দুঃখ করো না, বাঁচো !

রাগ !

এক টুকরো আকাশ !